জিললুর রহমান
১৫০
বছর পর মেঘনাদ বধ কাব্য পূনর্পাঠ
মাইকেল মধূসুদন
দত্ত মেঘনাদ বধ কাব্য লিখেছিলেন আজ থেকে ১৫০ বছর আগে। তার দীর্ঘ পথ চলায় বহু পাঠক
কবি সমালোচক এই মহাকাব্য পাঠ করেছেন, অনেক আলোচনা মন্তব্য জুড়েছেন বাংলার সাহিত্য
জগতে। আমি প্রথম মেঘনাদ বধ কাব্য পাঠ করি আমার ২০ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালে। এতো
দুর্বোধ্য ঠেকলো যে আমি সমগ্র আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলম। ৩ বছর পরে রামায়ণ পাঠ শেষ
করে আবার চোখ দিই মেঘনাদ বধ কাব্যের দিকে। প্রচল ভাষার দুর্বোধ্যতা কাটিয়ে কবিতায়
ঢুকতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে, রসাস্বাদন যুতসই হয় নি। তখন ঘেঁটে দেখি স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথও প্রথম যৌবন মাইকেলকে প্রচুর সমালোচনা করেছিলেন, যা বুদ্ধদেব বসু-রা
আরও কড়াভাবে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু-রা যখন মাইকেলী ভাষার সমালোচনায়
মুখর, তখন প্রবীণ রবিঠাকুর মাইকেলের প্রশস্তি রচনা করছেন। আমিও ভাবতাম এ কেমন
কাব্য! এর পাঠ-ই বা ক’জন করবেন? আমি জীবনানন্দ কী রবীন্দ্রনাথ
যেভাবে পড়েছি, মাইকেলকে কি সেভাবে পড়তে পেরেছি? এই সব ভাবতে ভাবতে এত বছর পর
মেঘনাদ বধ কাব্যের ১৫০ বছর পূর্তিতে এসে আবার পড়তে বসে আমারও কি মতান্তর ঘটছে? আজ
কি আমারও মনে হচ্ছে না যে মাইকেল হচ্ছেন কবিদের কবি?
এমনিতেই যে কোনো
কবিতার পূনর্পাঠ আমার ভেতরে নতুন বোধ জন্ম দেয়, কিন্তু আজ মেঘনাদ বধ কাব্য পড়তে
বসে আমার যে অসামান্য অনুভূতি, তা’ ভাষায় অপ্রকাশ্য।
আমি প্রতি ছত্রে ছত্রে রামায়ণের ছলনাকে গভীরভাবে অনুভব করতে থাকি, মনে মনে বারবার
প্রশ্নবিদ্ধ করি বাল্মীকিকে। আচ্ছা, যুদ্ধ কেনো বাধে? আমি যতো মহাকাব্য পাঠ করেছি
সব কিছুর পেছনেই রয়েছে যুদ্ধ। সেই রামায়ণ-মহাভারত-ই বলুন আর ইলিয়াড-ওডেসি-ই বলুন,
যুদ্ধ পুরুষের ক্ষমতার লড়াই হলেও তার পেছনে কোনো এক ছলনাময়ী নারীর ভূমিকা আছেই।
তবে কি নারীই যুদ্ধের মূল বীজ? এক সূর্পনখার রোষানল নেভাতে গিয়েই-তো রাবণের সীতা
হরণ আর তারই পরিণতি যুদ্ধ ও লঙ্কার পতন। তবে কি সব দোষ সূর্পনখার? লক্ষণ যে তার
প্রেমের কোনো মর্যাদা দেয়নি, তার কোনো দোষ নেই? প্রেমের মর্যাদা তো দূরে থাক, উলটো
তার নাসিকা কর্তন করেছিলো। অথচ তাকে দেবতুল্য মানতে হবে? মেঘনাদ বধ কাব্য পড়তে
পড়তে আমি রামায়ণের যুগে হারিয়ে যাই। আর আমার প্রতিটা ইন্দ্রিয় যেন লক্ষণকে দুষতে
থাকে। আবার জ্ঞানী রাবণই-বা কেন মূঢ় নারী সূর্পনখার প্ররোচনায় নিষ্পাপ দেবী সীতাকে
হরণ করলেন? সীতা তো লক্ষণের নয়, রামের স্ত্রী। এই সামান্য কারণে যে মহাযুদ্ধে
লিপ্ত হলো লঙ্কা ও অযোধ্যা, তার পরিণতিতে লঙ্কা হলো বীরশূন্য, পিতা পুত্রহারা, মায়ের
আঁচল সন্তানহীন।
আ-হা! বীরবাহুর
মৃত্যুতে চিত্রাঙ্গদার বিলাপে রক্ষ-কুলের রাজসভাই কেবল কাঁদেনি, আকাশ-বাতাস
আলুথালু করে কাঁদছে প্রকৃতি, প্রতিটি হৃদয়। যখন মা চিত্রাঙ্গদা রাক্ষসরাজ রাবনকে
দোষারোপ করেন অভাগা মায়ের অমূল্য সম্পদ রাজা হয়ে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে,
তখন শোকাহত পিতা একটু আগেই যিনি বিলাপে রত ছিলেন, দেশপ্রেমের চেতনা দিয়ে সে শোক
ভুলে থাকেন। উচ্চারিত হলো সেই মন্ত্রমুগ্ধ বাণী ‘জন্মভূমি রক্ষা
হেতু কে ডরে মরিতে? যে ডরে ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক তারে!’
নারী-প্রেম-দম্ভ-ছলনা
থেকে উৎসারিত যুদ্ধ দিয়েই মহাকাব্যের ভিত রচিত হয়, কিন্তু পরিশেষে কেবলই হাহাকার!
তবে কি যুদ্ধের ফলশ্রুতি হাহাকার বিবৃত করেই মহাকাব্য ক্ষান্ত? মহাকাব্য তার ছত্রে
ছত্রে বুনে যায় হৃদয়ের গভীর ভালোবাসাটুকু। মেঘনাদ বধ কাব্যও এই ভালোবাসারই কবিতা।
রামায়ণের আন্তর্বয়ন
করে এই মহাকাব্য লিখতে গিয়ে কবি বারবার বাল্মীকি আর কৃত্তিবাসকে স্মরণ করেছেন। তবে
আমার খটকা লেগেই থাকে, যখন দেখি রাবণকে রাক্ষস রাজ, রক্ষঃ কুল শিরোমনি – এরকম রামায়ণী
বিশেষণেই সম্ভাষণ করা হচ্ছে। আমরা জানি ইতিহাস বিজয়ীর পক্ষেই লিখা হয়, তাই
বাল্মীকি বিজয়ী রামের মনো-মত কাহিনী গড়েছেন। কিন্তু মধূসুদনের যুগে এই যুদ্ধ লঙ্কার
বিরুদ্ধে অযোধ্যার যুদ্ধ কি দেখানো যেতো না? রাবণ যথেষ্ট জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন বলেই
প্রতীয়মান হয়, তাকে রামভক্তদের মতো ১০ মাথা-অলা দৈত্য কী রাক্ষস হিসেবে বর্ণনা
করাটা সমীচিন মনে হয়নি। মহাভারতেও আমরা দেখি দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনির মতো নাম।
পৃথিবীর কোন্ পিতা তার সন্তানের নাম এমনতরো রাখতে পারে?
কবিতায় আন্তর্বয়নের স্রেষ্টতম নিদর্শনগুলোর মধ্যে মেঘনাদ
বধ কাব্য অন্যতম। আন্তর্বয়নের পরেও মহাকাব্যিক আবহের জন্য যে নিয়তি নির্ধারিত কিছু
অনুসঙ্গ থাকে, মধুসূদন দত্ত সে ব্যাপারে যেন প্রবল সচেতন ছিলেন। তাই ঘটনার বহু
আগেই নির্ধারণ হয় – ‘বিধির বিধি কে পারে লঙ্ঘিতে? মরিবে রাবণি রণে’। 
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন